খবর ডটকম (Khabar DTK) - সর্বশেষ বাংলা খবর

ঋণের অর্থ আদায়ে এখনো দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: গভর্নর

 

ঋণের অর্থ আদায়ে এখনো দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: গভর্নর

ঋণের অর্থ আদায়ে এখনো দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: গভর্নরের উদ্বেগ

দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঋণ আদায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণের অর্থ পুনরুদ্ধারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারছে না—এমন মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। তার ভাষায়, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা আনা গেলেও আদায়ে দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়নের বড় অংশই এসব ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে তাদের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য একাধিক নীতি সহায়তা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ আদায় নিশ্চিত করা যায় না। ফলে ব্যাংকের তারল্য চাপের মুখে পড়ে এবং নতুন ঋণ বিতরণেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ার কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় দুর্বল হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে অনেক বড় ঋণ সময়মতো আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকায় অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহিত হয়। তৃতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ঋণ পুনরুদ্ধারকে আরও জটিল করে তোলে।

গভর্নরের মতে, ঋণ বিতরণের আগে যথাযথ যাচাই–বাছাই এবং পরবর্তী সময়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে খেলাপি ঋণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বড় অংকের ঋণ বিতরণে কঠোর নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গভর্নর জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক–এর পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশনিংয়ের চাপ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি মূলধনে প্রভাব ফেলে। ফলে সরকারকে বারবার পুনঃমূলধন জোগান দিতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

গভর্নর বলেন, মূলধন জোগানের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র অর্থ সহায়তা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক নজরদারির গুরুত্ব

আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ঋণ আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্রেডিট স্কোরিং এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

গভর্নর উল্লেখ করেন, কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ও স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে করে একই গ্রাহকের একাধিক ব্যাংক থেকে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও কমবে।

আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজন

ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে দ্রুত বিচার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। বিশেষ আদালত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

গভর্নরের মতে, আইনি সংস্কার ছাড়া খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে কমানো সম্ভব নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিক মানদণ্ডে পরিচালিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক নজরদারি ও কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।

উপসংহার

ঋণের অর্থ আদায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনি সংস্কারের সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক বার্তা স্পষ্ট—ঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায় নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন